শাহবাগ চত্ত্বরে অনেকগুলো জটলা। দলবদ্ধভাবে চলছে প্রতিবাদ। গতকালের মতোই আমি যেখানে পাচ্ছি সেখানে যাচ্ছি। বুকে প্রতিবাদী টি-শার্ট ঝুলিয়ে স্লোগানের সমবেত উচ্চারণে কন্ঠ মেলাচ্ছি। জাদুঘরের সামনে গিয়ে দেখি 'জাতীয় স্বার্থে ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট'দের ব্যানার। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম চেনা মুখের খোঁজে। নাহ, কাউকে চিনতে পারলাম না। তবুও সমবেত স্লোগানে অংশ নিলাম। বছর দুয়েক ধরে ব্লগিং করলেও আমি বাংলা ব্লগের কোন কেউকেটা নই। আমাকে কেউ চিনবে এই আশাও করিনি। তবুও এই আন্দোলনের একজন হিসেবে আমার বুকভরে যাচ্ছিলো। গর্ব হচ্ছিলো এই মানুষদের নিয়ে।
মানুষ আমার খুব প্রিয় বিষয়। প্রচন্ড ভীড়েও একটা আনকোরা নির্জনতা অনুভব করা যায় চুপচাপ পাশ কাটিয়ে যাওয়া মানুষের স্রোতে নিরীক্ষণ করে। আজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম আত্মপ্রত্যয়ের স্রোত। ডুবোচরে প্রায়দৃশ্য একটা ক্ষোভের পূর্ণাংগ বিস্ফোরণ যেন দেখলাম। মানুষ নাকি নীরব থেকে সরব হওয়ার চেয়েও ভালোভাবে মনের ভাব প্রকাশ করে। কথাটার সত্যতা টের পেলাম চোখের ভাষায়, চোয়ালের দৃঢ়তায়। মানুষ জেগেছে। বিনা প্ররোচনায় মানুষ আসছে। উদ্দীপনা হতভাগা দেশটার মানচিত্র। সুন্দরতম জাতীয় সংগীত। বারবার স্বপ্নভঙ্গের পুরনো অভিশাপ মানুষকে প্রতিবাদী করে তুলেছে। ভিড়ভাট্টা সচেতনে এড়িয়ে চলা মানুষটিও এসেছেন সপরিবারে। প্রিয় মানুষের আঙ্গুল মুঠোবন্দি করে এসেছে প্রেমিক যুগল। ছিন্নমূল শিশুটিও স্লোগানে গলা মেলাচ্ছে। মোমবাতির নিভু নিভু সলতে সযত্নে আগলে রাখছে পরম মমতায়।
বাংলাদেশ, প্রিয় মাতৃভূমি আমার। তোমাকে মায়ের মতোই কখনো বলতে পারিনি ভালোবাসি। স্কুলে জাতীয় সংগীতের সময় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকেছি। সিনেমা হলে, জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানগুলোতে দাঁড়িয়ে যথাযথ সম্মান দেইনি তোমাকে। কদর্য রাজনীতির তীব্র বিষে নীল হয়ে মুখর হয়েছি তোমার সমালোচনায়। খেলার মাঠের পরাজয়ে অভিমানে বালিশ ভিজিয়েছি অনেকবার। উন্নত বিশ্বের মিডিয়া প্রসূত খোয়াবে তোমাকে ভুলেছি অনেকবার। মা আমার, তোমার বিপদের দিনে আমরা এসেছি। বুকের গহীনে লুকনো আমাদের ভালোবাসার কুঁড়িগুলো আজ শক্ত বৃন্তের যৈবতী ফুল। হৃদয়ের টান আমাদের আজ দাঁড় করিয়েছে শাহবাগে। ততদিন মাথা নোয়াবো না যতদিন 'কাদের মোল্লা'র মতো নৃশংস কসাই পা ফেলবে তোমার পবিত্র শরীরে। জয় বাংলা!