“সর্বশেষ ভোট গননার ফলাফল অনুযায়ী মেয়র পদপ্রার্থী অ্যাডভোকেট ইকবাল মাহমুদ তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হাজী আনোয়ার মিয়াঁ থেকে ১০,০০০ ভোটে এগিয়ে আছেন। আর মাত্র ৬ টি কেন্দ্রের ভোট গণনার ফলাফল............”
হাত বাড়িয়ে গাড়ির রেডিওটা অফ করে দিল এলিটা। হাসিমুখে তাকাল আমার দিকে। “অমন মন মরা হয়ে বসে আছ কেন? তুমি ১০,০০০ ভোটে এগিয়ে আছ! ইকবাল, তুমি শহরের মেয়র হতে চলেছ!”
আমি জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করলাম।
“আর ৬টা কেন্দ্র ভোট গননা বাকি। টেনশনের কোনও কারন নেই! আনোয়ার মিয়াঁ তোমাকে কিছুতেই টপকে যেতে পারবে না!”
আমি আর কিছু বললাম না।
“কিছু বলছ না কেন ইকবাল? আমাদের এতদিনের সাধনা সফল হতে চলেছে! আর তুমি এভাবে চুপচাপ বসে থাকবে?”
“ভাল লাগছে না, এলিটা”।
আমি জানালার কাচ নামিয়ে দিলাম। বাতাস দরকার, কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি হচ্ছে!
“কি পাগলের মত করছ? এসি চালান অবস্থায় কাচ নামিয়ে দিলে কেন?”
আমি মাথা বের করে দিয়ে বুক ভরে বাতাস নেয়ার চেষ্টা করলাম। ফুলস্পীডে ড্রাইভ করছে এলিটা। গাড়ি চলছে হাইওয়ে রোড ধরে। আমরা শহর ছেড়ে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি।
“তুমি টেনশন করোনা ইকবাল। পুরো ব্যাপারটা আমার উপর ছেড়ে দাও। দেখবে কীভাবে কাজটা সারি। কাক-পক্ষীও টের পাবেনা। ভরসা রাখ আমার উপর”।
ভরসা! হ্যা, ভরসা রাখা যায় এলিটার উপর। যেকোনো সমস্যার সুন্দরভাবে সমাধান করে দেয়ার একটা স্বভাবজাত গুন আছে তার। এলিটা ছিল বলেই আমি এতদুর আসতে পেরেছি! নাকি ভুল বললাম? আমি কি এতদুর আসতে চেয়েছিলাম? আসলে এলিটাই আমাকে এতদুর নিয়ে এসেছে। এলিটাই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। এলিটা বলেছিল এভাবে লেগে থাকতে পারলে আমি একদিন শহরের মেয়র হব, তারপর হব গোঁটা দেশের প্রেসিডেন্ট!
আসলে আমার নয়, এলিটারই উচিত ছিল রাজনীতিতে যোগ দেয়া। রাজনীতির মার প্যাচ এলিটার চেয়ে কেউ ভাল বোঝেনা। অভিনয় ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিলে এতদিনে অনেক নাম কামাতে পারত।
এলিটাকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম সেদিনের কথা আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে। স্ত্রী আর ২ ছেলে নিয়ে আমার সুন্দর একটা সংসার ছিল। সবে মাত্র রাজনীতিতে যোগ দিয়েছি। হাই লেভেলের নেতাদের সুনজরে পরেছি। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ব্যাপক আয়োজন হয়েছিল। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল উঠতি চিত্রনায়িকা ও মডেল এলিটার একক নৃত্য। আমি সাধারণত নাচ গান সিনেমা ইত্যাদি বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না। বলা বাহুল্য সেদিনের আগে আমি চিত্রনায়িকা এলিটাকে চিনতামও না। কিন্তু যে মুহূর্তে মেয়েটিকে দেখলাম আমি বুঝতে পারলাম I am in trouble! এ এক অমোঘ আকর্ষণ। মেয়েটি ধুমধারাক্কা গানের সাথে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে নাচল। হলভর্তি মানুষের সাথে আমিও মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। চেহারা আর ফিগারের এমন অপূর্ব কম্বিনেশন আগে কখনো দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার। সেদিন বাড়িতে ফিরে আমি আর কোনও কাজে মন বসাতে পারছিলাম না। রাতেও ঘুমও হলনা। ভুলে গেলাম আমি কারও স্বামী, কারও বাবা। আমার ধ্যান জ্ঞান সাধনা হয়ে উঠল এলিটাকে কাছে পাওয়া।
এর পর সব কিছু যেন স্বপ্নের মত ঘটতে থাকল। ফোনে যোগাযোগ করলাম। এক দিন দুই দিন দেখা করলাম। মেয়েটাকে পটিয়ে ফেলতে খুব একটা কষ্ট হয়নি। ঘর ছাড়লাম, সংসার ছাড়লাম, স্ত্রী-সন্তান ত্যাগ করলাম। বিয়ে করলাম এলিটাকে। অবশ্য একটা সময় আমি বুঝতে পারলাম আমি আসলে এলিটাকে পটাইনি, সেই আমাকে বশ করে ফেলেছিল। ক্ষমতার প্রতি তার খুব লোভ ছিল, সেই লোভ মেটানোর উপায় খুঁজে পেয়েছিল আমার মাধ্যমে।
এলিটাকে কাছে পাওয়ার পর আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের দ্রুত উন্নতি হতে লাগল। ২ বছরের মাঝে দলের কেন্দ্রিয় নেতাদের একজন হয়ে গেলাম। এলিটার বুদ্ধি পরামর্শ আর প্রেরনা আমাকে পথ চলতে সাহস দিত। শুধু পরামর্শ দেয়াটাই সব নয়, কখনো বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে গেলে এলিটা নিজেই এগিয়ে আসত ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করার জন্য। আমাকে এতদূর নিয়ে আসার জন্য তাকে অনেক কিছুই করতে হয়েছে। মেয়র হিসেবে আমার নমিনেশন পাওয়ার জন্য তাকে ঘুরতে হয়েছে উপরের লেভেলের নেতাদের দ্বারে দ্বারে। নমিনেশন পাওয়ার পর সমর্থন আদায়ের জন্য বিশিষ্ট শিল্পপতি আর প্রভাবশালী ব্যাক্তিদের কাছে যেতে হয়েছে তাকে। এলিটার রুপ যৌবনের জন্য সবাই পাগল ছিল। আমি এলিটাকে জিজ্ঞেস করিনি কখনো কিন্তু জানি অনেকের সাথেই তাকে রাত্রি যাপন করতে হয়েছে। গভির রাত পর্যন্ত পার্টি করে বাড়িতে ফিরেছে পরের দিন। আমার এই মেয়র হওয়ার পিছনে আমার চেয়ে এলিটার অবদানই বেশি।
শহর ছেড়ে অনেক দূর চলে এসেছি। জায়গাটা একদম নির্জন। রাস্তার দুপাশে ঘন গাছপালায় ঘেরা। এলিটা রাস্তা থেকে গাড়ি নামিয়ে কয়েকটা গাছের আড়ালে নিয়ে পার্ক করল। গাড়ি থেকে নামল সে। আমি বসেই থাকলাম।
“কি ব্যাপার নামছ না কেন? আমি একা কাজটা করব কীভাবে?”
আমি নামলাম। দুজনে গাড়ির ব্যাকসাইড উচু করলাম। স্লিপিং ব্যাগটা ডলা মোচড়া হয়ে পরে আছে। তার ভেতর থেকে একটা বাচ্চা ছেলের দুটো পা বেড়িয়ে আছে। আমি কিছু ভাবতে পারছি না। বুক ঠেলে কান্না বেড়িয়ে আসতে চাইছে!
এলিটা চাপা গলায় বলল, “ইকবাল! তুমি কি শুরু করলে? কান্না কাটি বাসায় গিয়ে করো! এখন আমাকে লাশটা নামাতে সাহায্য কর!”
আমি বললাম, “আর একবার ভেবে দেখ এলিটা! আমার মনে হচ্ছে কাজটা ঠিক হচ্ছে না!”
“ভাবাভাবির সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে ইকবাল! এখন হাত লাগাও তাড়াতাড়ি লাশটা মাটি চাপা দিতে হবে”।
আমরা দুজনে মিলে বাচ্চার লাশটা নামিয়ে আনলাম। টেনে হিঁচড়ে নিয়ে নিয়ে গেলাম জঙ্গলের ভেতরের দিকে। এলিটা এবার গাড়ি থেকে একটা বেলচা এনে আমার হাতে ধরিয়ে দিল। বলল, “কবর খুদে ফেল”।
আমি বেলচা হাতে দাড়িয়ে রইলাম।
“ইকবাল! ফর গডস সেক! যা বলছি কর! আমাদের হাতে সময় খুব কম। দলের কেন্দ্রিয় সচিব জাকির ভাই আজ তোমার নির্বাচনে জয়লাভ উপলক্ষে বিশেষ পার্টি আয়োজন করেছেন। আমাদের সেখানে উপস্থিত থাকতেই হবে”!
আমি কবর খুদতে শুরু করলাম। কাজটা দ্রুত করার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছিনা। হাত কাঁপছে। কতক্ষন একনাগাড়ে মাটি খুঁড়লাম জানিনা। একসময় এলিটা বলল, “থাম, হয়েছে আর লাগবে না”।
আমি দেখলাম একজন শোয়ানোর মত গর্ত হয়েছে।
এলিটা বলল, “এস লাশটা নামিয়ে দেই”।
“এলিটা আর একবার ভেবে দেখ কাজটা ঠিক হচ্ছে কিনা”!
“তোমাকে একবার বলেছি ভাবার সময় শেষ। আমাদের দ্রুত করতে হবে! মনে হচ্ছে আজ জাকির ভাইয়ের পার্টিতে সময়মত উপস্থিত হতে পারব না”!
আমি চুপচাপ দাড়িয়ে থাকলাম।
“ফর গডস সেক! ইকবাল ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর! এছাড়া আমাদের আর কোনও উপায় ছিলনা!”
মোবাইল ফোনের রিং বেজে উঠল।
“মোবাইলটা বের কর ইকবাল! দেখ কে ফোন করেছে!”
আমি বের করলাম। দলীয় সচিব জাকির হায়দারের ফোন। বললাম, “তোমার জাকির ভাই ফোন দিয়েছে”।
"রিসিভ কর! কথা বল"।
“আমি পারব না এলিটা!”
এলিটা হাত থেকে মোবাইলটা প্রায় কেড়ে নিল এলিটা। বড় করে একটা শ্বাস নিল। রিসিভ করল ফোনটা। তারপর মিষ্টি গলায় বলল, “হ্যালো জাকির ভাইয়া? স্লামালেকুম”।
ওপাশ থেকে কিছু বলা হল।
“আল্লাহ তাই? আনঅফিসিয়াল ডিক্লেয়ার দেয়া হয়ে গেছে? কত ভোট বললেন?”
আবার ওপাশ থেকে কিছু বলা হল।
“ওহ গড ওহ গড! মোট ১৫,০০০ ভোট বেশি পেয়েছে ইকবাল! ইস! আমার যে কি খুশি লাগছে!”
আমি যেন অস্পষ্ট একটা গোঙ্গানির আওয়াজ শুনলাম! খস খস আওয়াজ হচ্ছে! আমি লাশটার দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলাম। সর্বনাশ! ছেলেটা বেঁচে আছে! ব্যাগের ভেতর হাত পা ছোড়াছোড়ি করছে! কিন্তু এলিটা তো বলেছিল ছেলেটা মৃত!
এলিটা ফোনে কথা বলছে, “না জাকির ভাই! আজ মনে হচ্ছে আর আসতে পারছি না। আমার শরিরটা ভাল লাগছে না। ইকবাল কে নিয়ে আমার মায়ের বাড়ি যাচ্ছি। আপনি প্লিজ পার্টিটা একদিন পিছিয়ে দিন”!
আমি তাকিয়ে আছি এলিটার দিকে! কি সুন্দর করে ফোনে কথা বলে যাচ্ছে! কেউ ভাবতে পারবে আমার সামনে দাড়িয়ে থাকা এই অপূর্ব সুন্দর মেয়েটি একটু আগে একটা বাচ্চা ছেলেকে গাড়ি চাপা দিয়েছে?
মাত্র ২ ঘণ্টা আগের ঘটনা।
আমরা গাড়ি করে এলিটার মায়ের বাসায় যাচ্ছিলাম। ড্রাইভ করছিল এলিটা। ফুল ভলিউমে গান বাজছিল। গানের তালে তালে মাথা ঝাকাচ্ছিল সে। আমি বার বার সাবধান হতে বলছিলাম, স্পিড কমিয়ে রাখতে বলছিলাম। কিন্তু এলিটা আমার বেশিরভাগ কথাই শোনেনা। এটাও ছিল তার মধ্যে একটা। শহরের এইদিকটাতে জনবসতি একটু কম। রাস্তা ঘাট মোটামোটি খালিই থাকে। একটা ১০-১২ বছরের বাচ্চা ছেলে রাস্তার পাশে দাড়িয়ে একা একাই বল নিয়ে খেলছিল। বলটা হাত থেকে ছুটে গিয়ে রাস্তার উপর এসে পড়ল। ছেলেটা দৌড়ে এল বলটা ধরতে। আমি আঁতকে উঠে এলিটাকে ব্রেক করতে বললাম। এলিটা ব্রেক করল, কিন্তু ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ধাক্কা খেয়ে অনেকটা দূরে ছিটকে পড়ল ছেলেটা। দ্রুত নামলাম গাড়ি থেকে। ছেলেটা দলা মোচড়া হয়ে পড়ে ছিল। তার রক্তাক্ত মুখ দেখে আতংকের একটা ঢেউ নামল আমার শিরদাঁড়া বেয়ে। এলিটা দ্রুত হাতে পালস পরিক্ষা করল, ছেলেটার বুকে মাথা রেখে হার্ট বিট শুনার চেষ্টা করল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, “মারা গেছে”।
আমার মনে হচ্ছিল পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে গেছে। আমি গাড়ির বনেটে হাত রেখে তাল সামলানোর চেষ্টা করলাম। এইসব ক্ষেত্রে এলিটার মাথা দ্রুত কাজ করে। সে বলল, “কেউ দেখেনি এই ঘটনা ইকবাল! আমাকে সাহায্য কর। দ্রুত ছেলেটাকে গারিতে তুলে নিতে হবে”।
এলিটা গাড়ির পেছন থেকে স্লিপিং ব্যাগ বের করল। দুজনে মিলে ছেলেটাকে ব্যাগে ভরে ফেললাম। তারপর গাড়ির পেছনে তুলে রাখলাম। এর পর আবার ফুলস্পিডে গাড়ি ছোটাল এলিটা। একবার শুধু বলল, “তুমি টেনশন করনা। কেউ কিচ্ছু টের পাবেনা। যত দ্রুত সম্ভব শহরের বাইরে চলে যেতে হবে। ঘন গাছাপালায় ঘেরা জায়গাটাতে গিয়ে গাড়ি থামিয়ে ছেলেটাকে কবর দিয়ে আসব”।
আমি হ্যা বা না কিছুই বললাম না। তখন স্বাভাবিক চিন্তা করার ক্ষমতা ছিলনা আমার। কিন্তু এখন আছে! আমি চাপা গলায় বললাম, “এলিটা”।
এলিটা ফোন কানেই আমার দিকে ঘুরে তাকাল।
আমি আঙ্গুল দিয়ে বাচ্চাটার দিকে তাকাতে বললাম তাকে।
ব্যাগের ভেতর বাচ্চাটা নড়ছে দেখে তার চোখগুলো বড় বড় হয়ে উঠল। সে কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখেই বলল, “আচ্ছা জাকির ভাই, রাখি তাহলে। কাল কথা হবে”।
আমি বললাম, “তুমি বলেছিলে ছেলেটা মারা গেছে!”
“ছেলেটা শ্বাস নিচ্ছিল না ইকবাল! আমি ভাবলাম মরে গেছে”।
“কিন্তু মরেনি! ওকে বাঁচাতে হবে”।
“এখন তুমি কি করতে চাও?”
“মোবাইলটা আমাকে দাও। অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে”।
“বোকার মত কথা বলনা ইকবাল”।
“মোবাইলটা দাও এলিটা”।
“তুমি কি পাগল হয়ে গেছ ইকবাল? এক্সিডেন্ট হয়েছে শহরের রাস্তায় আর তুমি ছেলেটাকে শহর ছেড়ে এত দূরে নির্জন বনে নিয়ে এসে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে চাইছ?”
“এটা তোমার বুদ্ধি ছিল, আমার না”।
“আমার আর তোমার বলে তো কিছুই নেই ইকবাল। আমি যা করেছি আমাদের জন্য করেছি”।
আমি অস্থির কণ্ঠে বললাম, “এলিটা! গিভ মি দ্যা ড্যাম মোবাইল”।
“না! আমি তোমাকে এটা করতে দেবনা" এলিটার চোখদুটো যেন দপ করে জ্বলে উঠল। "অনেক কষ্টে সব কিছু গুছিয়ে আনার পর এত সহজে আমি তা তোমাকে নষ্ট করতে দেবনা! একবার ভেবে দেখ তোমার এতদিনের স্বপ্ন যখন সত্য হতে চলেছে তখন এধরনের একটা ঘটনায় জড়িয়ে পড়লে তা ধুলোয় মিশে যাবে”।
“এলিটা! যেখানে একটা বাচ্চা ছেলের বাঁচা মরার প্রশ্ন সেখানে এত কিছু ভাবার অবকাশ নেই, আমার স্বপ্ন সত্যি করার জন্য আমি একটা বাচ্চা ছেলেকে বলি দিতে পারব না”।
“ভাবতে তোমাকে হবে ইকবাল! তোমার এই এত দূর আসার পেছনে কতটা কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে আমাকে তা তো নিশ্চয়ই তোমার অজানা নয়! তুমি কি ভেবেছ? কি দেখে আমি তোমার প্রেমে পড়েছিলাম? কি দেখে তোমাকে আমি বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলাম? আমার সৌন্দর্যে সবাই পাগল ছিল ইকবাল! যেকোনো বিরাট ধনাঢ্য ব্যাক্তিকে বিয়ে করে আমি পায়ের উপর পা তুলে বসে খেতে পারতাম। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম ক্ষমতা! আমি তোমার মাঝে সেই সম্ভাবনা দেখেছিলাম। আমি জানতাম তোমার পক্ষে একদিন ক্ষমতার উচ্চ শিখরে পৌছে যাওয়া সম্ভব। সেই জন্য আমাকেও যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছে। আজ তুমি মেয়র হয়েছ! কাল তুমি হবে প্রেসিডেন্ট। দেশের সকল ক্ষমতার মালিক হব আমরা! আমার সেই স্বপ্নকে তুমি চাইলেই গুড়িয়ে দিতে পারনা!”
আমি চুপ করে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইলাম। কিছু বলতে পারলাম না।
এলিটা বলে চলেছে, “ভেবে দেখ যখন লোকে জানবে তুমি এধরনের একটা কাজ করেছ তখন কি হবে! পার্টি নিজেদের জনসমর্থন হারাবার ভয়ে তোমাকে বর্জন করবে, মানুষ তোমাকে ঘৃণা করবে, মেয়র পদে বসার আগেই রাস্তায় ছুড়ে ফেলা হবে তোমাকে! ছেলেটি যদি মারা যায় তাহলে জেল জরিমানা কোনও কিছু বাদ থাকবে না!”
মাথা তুলে এলিটার দিকে তাকালাম আমি। “তুমি কি করতে চাও?”
এলিটা বড় করে একটা শ্বাস নিল। “যা করার করছি আমি। তোমাকে ভাবতে হবেনা। যাও চুপ চাপ গাড়ির ভেতর গিয়ে বসে থাক”।
আমি এসে গাড়ির ভেতর বসলাম। এলিটাকে দেখতে পাচ্ছি বেলচাটা হাতে তুলে নিল! দুহাতে সেটা মাথার ওপর তুলে সমস্ত শক্তি দিয়ে নামিয়ে আনল ছেলেটার মাথার ওপর। আমি শিউরে উঠে চোখ ফিরিয়ে নিলাম।
মনে মনে বললাম, “আমি কিচ্ছু দেখিনি! আমি কিছু জানিনা....!”
লিখেছেনঃ নাজিম-উদ-দৌলা